Statement on the closed tea gardens of North Bengal

February 2, 2016

মাত্রাতিরিক্ত নাটকীয়তা চলছে ডানকানসের চা বাগানগুলোকে নিয়ে। গত ২০১৫-র মার্চ-এপ্রিল থেকে কার্যত বন্ধ ডানকানসের ১৬ টা চা বাগান। শ্রমিকরা মজুরি ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। যার ফলশ্রুতিতে তাঁদের জীবন একদম তলানিতে এসে ঠেকেছে। অনাহার-অপুষ্টিতে চা শ্রমিকদের মৃত্যুর চিরাচরিত ধারাটা যেন এক ধাক্কায় বেড়ে গেছে বেশ কয়েকগুণ, এই বাগানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর। অথচ সরকারীভাবে বন্ধ হয়নি ডানকানসের বাগানগুলো। ফলে বন্ধ বাগানের জন্য যে ছিটেফোঁটা সুযোগসুবিধাগুলো সরকারীভাবে প্রাপ্য, ডানকানসের এই বাগানগুলোতে শ্রমিকরা পাচ্ছেন না সেসবও। শ্রমিকদের জন্য এর চেয়ে অসহায়তার পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

এক বছর গড়াতে চললো এরকম একটা না ঘরকা না ঘাটকা পরিস্থিতি চলছে। অথচ কোথাও কোনো সরকারী প্রচেষ্টা, মালিকী প্রয়াস, আইনী চাপানউতোর দেখা যাচ্ছিল না। ক্রমশঃ ভোট যত এগিয়ে আসলো, আমরা নানা খেলা দেখতে শুরু করলাম। গত তিন-চার মাস ধরে রাজ্য সরকারের সাথে ডানকান গোষ্ঠীর কর্ণধার গোয়েঙ্কাদের যে কী কথা হচ্ছে! কখনও বলা হল, একটা বাগান বিক্রি করে দিয়ে ৭০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ নিয়ে ময়দানে আবার নামবে ডানকান গোষ্ঠী। ক’দিন চললো খুব তত্পরতা! মুখ্যমন্ত্রী উন্মুক্ত জনসভায় উদাত্ত আহ্বান রাখলেন, মালিকরা যদি বাগান চালাতে না পারে তাহলে সরকারকে দিয়ে দিক— সরকার বাগান চালাবে! গত বছরের গোড়াতেই যে সরকার নিজে তার হাতে থাকা ৫ টা বাগান বেসরকারী মালিকদের কাছে বেচে দিয়েছে, সেই অপ্রিয় প্রসঙ্গটা আর এখানে বাড়ালাম না। বাস্তবে কিছুই হল না— না সরকারী, না মালিকী, না আইনী-বেআইনী, প্রশাসনিক কোনোরকমের হস্তক্ষেপই দেখলাম না আমরা, দেখলাম শুধু দিনের পর দিন শ্রমিকরা ডুবে যাচ্ছেন আরও কষ্টে, দারিদ্রে, অনাহারে, অসহায়তায়, অনিশ্চয়তায়…

মাঝে আরও একবার বাগান খোলার কথা শোনা গেল— জানুয়ারী থেকে খুলবে বলে হাওয়ায় খবর ভেসে এল। খুললো না বাগান। ভোট বড় বালাই। ভোটের বাদ্যি জোরালো হতে শুরু হতেই আবার কী করে যেন কী হল… গত ২২ জানুয়ারী একটা বৈঠক হল, সরকারী শ্রমদপ্তরের মধ্যস্থতায়, ডানকানগোষ্ঠীর সাথে… তাতে আবার নির্ধারিত হল বাগান খোলা হবে ১ ফেব্রুয়ারী থেকে। ৩১ জানুয়ারী বকেয়া বেতনের একটা অংশ মিটিয়ে দেওয়া হবে, তারপর আরো তিন কিস্তিতে মেটানো হবে বাকি বকেয়া। মজুরি আপডেট করা হবে অর্থাৎ ডানকানসের বাগানগুলোতে ২০১৫-র ফেব্রুয়ারীতে চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের চা-শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়ার কথা তা দেওয়াই হয়নি, তখন থেকেই মজুরি বন্ধ করে দিয়েছে তারা। এই সব ঘোষণা তো হল। সবাই আশা-আশঙ্কায় বুক বেঁধে আছে। না আঁচালে বিশ্বাস নেই বলে পেটে গামছা বাঁধা শ্রমিকরা দম ধরে বসে আছেন।

ঠিক সেই সময় ২৮ তারিখ ময়দানে অবতীর্ণ হল কেন্দ্র সরকার। তারা আবার ঘোষণা করে বসলো ডানকানসের ৭ টা বাগান তারা অধিগ্রহণ করছে। গেজেট নোটিফিকেশন জারি হয়ে গেল। মাদারিহাট ব্লকের সাতটা প্রায় লাগোয়া ডানকানসের চা বাগান অধিগ্রহণ করবে তারা। এই অধিকার বা সুযোগ সরকারের আছে। এত এত বন্ধ বাগান — এতদিন ধরে বন্ধ, সেখানে কোনরকমে এই সাতটা বাগানের অধিগ্রহণের কথা যে এসেছে, তা ভালোই! কিন্তু প্রশ্ন তো সাথে সাথেই আসবে যে বাকি বন্ধ বাগানগুলোর কী হবে?

এদিকে কেন্দ্র সরকার বাগান অধিগ্রহণের কথা বলার সাথে সাথেই টালবাহানা শুরু করেছে ডানকান-গোয়েঙ্কা গোষ্ঠী। ৩১ জানুয়ারী বকেয়া দেয়নি, ১ ফেব্রুয়ারী বাগান খোলেনি। তারা বলছে কেন্দ্র সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে, আর অন্য দিকে এই গেজেট নোটিফিকেশনে কী আছে সেটা বোঝার জন্য নাকি তারা সময় নিচ্ছে, তাই শ্রমিকরা বকেয়া পেলেন না, বাগানও খুললো না। আশ্চর্য! রাজ্য সরকার-কেন্দ্র সরকার-ডানকান গোষ্ঠীর তৈরী ঘোলাজলে হাবুডুবু খাচ্ছেন শ্রমিকরা। ডুবে যাচ্ছেন আরও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

এখন, সোজা প্রশ্ন ডানকান গোষ্ঠীকে— তারা বকেয়া মেটাবে না কেন, বাগান খুলবে না কেন? ২২ তারিখের মিটিংয়ে তো সেসব কথা হয়েছিল। আর অন্যদিকে কেন্দ্র সরকারের নোটিফিকেশনে তো বকেয়া নিয়ে কোনো আলাদা কথা নেই। অধিগ্রহণ নিয়ে যাই হোক না কেন, বকেয়া তো মেটাতেই হবে! তাহলে কেন টালবাহানা? আর কতদিন শ্রমিকরা মিথ্যে আশ্বাসের পিছনে ঘুরে বেড়াবে?

রাজ্য সরকারের শ্রমদপ্তরের উদ্যোগে ২২ জানুয়ারির মিটিং হল, এখন সেই মিটিংয়ের সিদ্ধান্তকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে কী করে ডানকান গোষ্ঠী পার পেয়ে যাচ্ছে? এবং এটা একবার নয়, বারংবার হয়ে চলেছে— বাগান সরকারীভাবে বন্ধ হয়নি অথচ শ্রমিকদের প্রাপ্যগুলো বন্ধ; বাগান চালুর কথা, বকেয়া দেওয়ার কথা হয়েছে বারংবার— তাও কিছুই হয়নি! শ্রমদপ্তর কী ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবে এভাবেই দিনের পর দিন? একটা মালিকগোষ্ঠী দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাবে, অথচ সরকারের শ্রমদপ্তর কিছুই করবে না?

কেন্দ্র সরকার কতকগুলো বাগান অধিগ্রহণের কথা বলেছে, ভালো কথা! কিন্তু ডানকানসের বাকি বন্ধ বাগানগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে তা বলা নেই, আরও অন্য বন্ধ বাগানগুলোর কী হবে তাও নেই, বকেয়াগুলো কীভাবে মেটানো হবে তাই নিয়ে কোনো নির্দেশিকা নেই, রাজ্য-কেন্দ্র-মালিকের গোলকধাঁধাঁয় কী করে সমাধান হবে ডানকানসের ডামাডোল তারও কোনো গাইডলাইন নেই। শুধু চটকদার ঘোষণা আছে! আমরা স্পষ্ট সমাধান চাই!

আমাদের দাবি —

১) ডানকান-গোয়েঙ্কা গোষ্ঠীকে অবিলম্বে সমস্ত বাগানে শ্রমিকদের বকেয়া মেটাতে হবে, মজুরি চালু করতে হবে।

২) রাজ্য সরকারের শ্রম দপ্তরকে মালিকগোষ্ঠীর ওপর চাপসৃষ্টি করতে হবে এবং কেন্দ্র সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে যাতে সমস্ত বাগানে শ্রমিকদের বকেয়া মেটানো হয়।

৩) কেন্দ্র সরকারের বাগান অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ঘোষণার ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য অবিলম্বে রাজ্য সরকার ও মালিকপক্ষের সাথে, এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্ট সহমতের উপর দাঁড়িয়ে বাগান অধিগ্রহণ, বকেয়া প্রদান, শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ও বাগান কীভাবে চলবে — তার সমগ্র পদ্ধতি কেন্দ্র সরকারকে ঘোষণা করতে হবে।

৪) ডানকানসের বাকি বাগানগুলোর জন্য কেন্দ্র সরকারের কী নিদান, সেটা স্পষ্ট করতে হবে। আমাদের দাবি, বাকি ডানকানসের বাগানগুলো সহ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অন্য বাগানগুলোও অধিগ্রহণ করতে হবে।

চা বাগান সংগ্রাম সমিতি (Cha Bagan Sangram Samiti)