আসামে আর একটা রোহিঙ্গা-সঙ্কট চাই না – APDR Press Statement on Assam

August 1, 2018

প্রেস বিবৃতি

কলকাতাঃ জুলাই ৩০, ২০১৮

আসামে আর একটা রোহিঙ্গা-সঙ্কট চাই না

আসামে নাগরিকত্ব নথিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে চরম অসন্তোষ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্তী উদ্বেগের কারণ নেই জানিয়ে ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী সেখানে পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি নিজেই যথেষ্ট উদ্বেগে রয়েছেন। তিনি জানেন ভারতের সুপ্রীম কোর্টের তদারকি সত্বেও নাগরিকত্ব নথিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটি তলায় তলায় ঘটানো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে-নিরপেক্ষভাবে নয়, ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ভবিষ্যত ঠিকানা তাদেরকে না জানিয়ে, গোপন বা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দিয়ে। এই অন্ধকারময় ভবিষ্যতের উদ্বেগ (আটক, বিতাড়ন, নির্যাতন, সর্বস্ব হারানোর ভয়) বাধ্য করেছে হানিফ খানের মতো মানুষদের (প্রথম দফার তালিকা প্রকাশের পর) আত্মহত্যা করতে; অন্যদিকে প্রতিবাদে জ্বলে উঠতে। বহু মানুষ (প্রধানত বাঙালী মুসলমান জনগোষ্ঠী)-কে সামাজিক জীবন থেকে উৎপাটিত করে ‘ডিটেনশন-ক্যাম্পে’ রাখা হবে, যে জন্য গোয়ালতোড়-এর ডকুরভিটায় ২০ বিঘা জমি আসাম সরকার বরাদ্দও করেছে (৩০০০ মানুষের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প নির্মাণে)।

এনআরসি (২০১৪-র ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশিকার মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল) সঙ্গেই ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকার একটি নারগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল পেশ করেছে যার লক্ষ্য হল অন্য দেশ থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, পারসি, জৈন বা খ্রীষ্টান ‘অবৈধ নাগরিক’ হলেও তাদের  সকলকেই ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এনআরসি প্রক্রিয়া একটি বিশেষ ধর্ম ও ভাষা সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে কোনঠাসা করার লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই বৈষম্য মানবাধিকারের অবমাননা এবং নিন্দনীয় বলে এপিডিআর মনে করছে। এদেশ ও বিদেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ ইত্যাদি ধর্মের মানুষজনেরাও নিরাপত্তা বিপন্ন হবার আশঙ্কায় প্রতিবাদ করছেন। 

আসামে চারটি সমান্তরাল নাগরিকত্ব-নির্ণায়ক প্রক্রিয়া (নির্বাচন কনিশনের অসাংবিধানিক ‘ডি-ভোটার’ ঘোষণা, বর্ডার পুলিশের প্রতি নির্দেশ অবৈধ নাগরিক মনে হলে জেলে পাঠাও, ‘বিদেশী’-নির্ণায়ক ট্রাইব্যুন্যাল এবং সর্বোপরি(এনআরসি) চলেই বা কি করে? সব মিলিয়ে ‘হেনস্থা-রাজ’ কায়েম হয়েছে আসামে; কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে তার জবাবদিহি করতে হবে।

সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তি ‘রিফাউলমেন্ট’ বা পুশ-ব্যাক-এর ভীতি তৈরি করছে। এটা ঘটেছে ও ঘটানোর চেষ্টা চলছে যেহেতু ভারত আজও রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়েও একই খেলা চলছে। 

আসামে অভিবাসী সমস্যা এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয় জেনেও ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই সমস্যা নিয়ে ‘প্রত্যক্ষ’ আলোচনা এড়িয়ে চলছে। এটা আশ্চর্জজনকই শুধু নয়, নীতিগত সুবিধাবাদ ও দিশাহীনতার পরিচায়ক। এটা উল্লেখযোগ্য যে ২০১২ সালে বাংলাদেশের আনুমানিক ১০ লক্ষ ‘অবৈধ’ ভারতীয় অভিবাসীদের কাছ থেকে ভারত ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পেয়েছে! তাই, এপিডিআর দাবি করে ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকে এজেন্ডা করে দ্বিপাক্ষিক মীমাংসায় আসুক দুটি দেশ। আসামে নাগরিকত্ব নথিবদ্ধকরণের প্রেক্ষাপটে এটা অত্যন্ত জরুরি।

এপিডিআরআরোমনেকরেআসামেরসরকার ‘ডক্যুমেন্টযাচাইকে’ ইস্যুকরেতথাকথিত ‘বাংলাদেশীঅনুপ্রবেশকারী’-রসমস্যাকেপশ্চিমবঙ্গসহঅন্যরাজ্যেওচালানকরতেচায়।এপিডিআরএরনিন্দাকরছে। 

এপিডিআর-এর কাছে সবচয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হল আসামে ‘বাংলাদেশী’ সন্দেহে অসংখ্য আটক ব্যক্তিদের (পুরুষ,নারী, শিশু ও বৃদ্ধ) মানবাধিকারের প্রশ্নঃ ডিটেনশন কেন্দ্রে তারা দীর্ঘকাল বিনা-বিচারে বা বিনা-দোষে আটক অথবা না-জানিয়েই বিচারে দোষী সাব্যস্ত, তাদের প্রায় কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না, এমনকি ‘নাগরিক-বন্দিদের’ সঙ্গেও মেলামেশা করতে দেয়া হয় না। এক কথায় অবস্হা ‘অবর্ণনীয়’! এক্ষেত্রে ভারত সরকারের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা এবং অবজ্ঞা সর্বজনবিদিত। আসামের বহু সংগ্রামী মানুষ, উপজাতিসত্তা, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের উপর দীর্ঘ অত্যাচার, নির্যাতনের ও দাঙ্গার যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে যার কার্যতঃ কোন প্রতিকার হয়নি। নেলী-দাঙ্গার (১৯৮৩) ক্ষতিগ্রস্তরাও আজ বিতাড়নের ভয়ে দিশাহারা। এই কারণে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পরিদর্শকমন্ডলীর আওতায় সার্বিক তদন্তের ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছে এপিডিআর।  রাষ্ট্রসংঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনেরও হস্তক্ষেপ চায় এপিডিআর। আসামের অভিবাসী সমস্যা নিয়ে তার চারজন রাপোর্টিয়র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

সন্দেহবশে কোন বিতাড়ন ও বন্দি রাখা মনুষ্যত্বের চরম অবমানা; একইভাবে ‘স্টেটলেস-সিটিজেন’ ঘোষণা আমরা মানবো না। আমরা নিজ রাজ্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনানুযায়ী সম্মানজনক পুনর্বাসনকেই যথাযথ সমাধান বলে মনে করি।

প্রসঙ্গত, গত তিন দশক ধরে একটি ‘বিশ্ব-গ্রাম’(Global Village)–এর স্বপ্ন ফেরি করে ‘বিশ্বায়নে’র মহাযজ্ঞ চলছে। আর এক দিকে আসামে ‘সন্দেহভাজন-নাগরিকত্ব’ চিহ্নিতকরণ, বিভিন্ন দেশে আমেরিকা-ন্যাটো-গোষ্ঠীর বোমাবর্ষণে বা মায়নামারে সামরিক ও সাম্প্রদায়িক হিংসায় দেশছাড়াদের আশ্রয় দিতে অস্বীকার করা অথবা প্রতিবেশী দেশের সীমানায় পাঁচিল বা কাঁটাতার দিয়ে সীমান্তবাসীদের চিরাচরির আদান-প্রদান নিশ্ছিদ্র ভাবে ‘সীল’ করাও প্রক্রিয়াও চলছে। কর্পোরেট-পোষিত রাজনীতিকদের এ জাতীয় সব পন্থার বিরোধিতা করে এপিডিআর।

pastedGraphic.png

(ধীরাজ সেনগুপ্ত)