জেলখানায় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ

May 14, 2014

– সব্যসাচী গোস্বামী

প্রেসিডেন্সি জেলে থাকাকালীন হিন্দি ‘ভোর’ ম্যাগাজিনটা আমাদের হাতে আসে, সেখানে অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সীমা আজাদের একটা হৃদয়গ্রাহী প্রবন্ধ আমরা পাই, যা পরে আমাদেরই একজন সাথী সুভাষ রায় বাংলায় অনুবাদ করেন, ‘গারদের আধার ফুঁড়ে ভোরের আলো’ শিরোনামে। প্রথমেই বলা ভাল সীমা আজাদ ও তার জীবন সাথী বিশ্ববিজয়কে উত্তর প্রদেশের পুলিশ একটি সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করেছিল। বিচারে তাদের যাবজ্জীবন সাজাও ঘোষনা হয়, যদিও পরে তাদের জামিন মঞ্জুর করেন উত্তরপ্রদেশ হাইকোর্ট। এই মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে সে সময় গণতান্ত্রিক মানুষ সোচ্চারও হয়েছিলেন মনে আছে। জেলে আমরা হাতে পেয়েছিলাম সীমা আজাদেরই জেলের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা। কিভাবে জেল জীবনে তিনি সাধ্য মতো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন সে কথা আমদের ভীষণভাবে অনুপ্রানিত করেছিল।

আজ পশিমবঙ্গের জেলেও আছেন শতাধিক রাজনৈতিক বন্দী। তারা প্রত্যেকেই বস্তুতঃ শাসকদলগুলোর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সিপিএম পরিচালিত ‘বাম’(?!)ফ্রণ্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত ‘মা-মাটি-মানুষ’ সরকার, প্রত্যকের আমলেই প্রতিবাদী জনতাকে বারবার মিথ্যা মামলায় জেলে পোরা হয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে আমাকে দুই সরকারের সময়ই জেলে যেতে হয়েছে, এটা অবশ্য সেই সব সরকারগুলির দূর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। মোট তিন দফায় আমি ৬ বছর ৯মাস জেলে থেকেছি। দুটো কেন্দ্রীয় কারাগার, তিনটে জেলা কারাগার এবং দুটো সাবজেলে আমার থাকার সুযোগ হয়েছে, ফলতঃ স্বাভাবিক ভাবেই আমি অসংখ্য রাজবন্দীর সান্নিধ্য পেয়েছি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চন্ডী সরকার, অজিত চক্রবর্তী, হিমাদ্রী সেন রায় (সোমেন), পতিতপাবন হালদার, গৌরনারায়ন চক্রবর্তী, অখিল চন্দ্র ঘোষ, জাকির হুসেন, সাদুলা রামাকৃষ্ণন। জেল জীবনে তাদের আমি বেশ কাছ থেকে দেখেছি এবং তাদের সাথে নানা জেল সংগ্রামে অংশগ্রহন করার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি যে অতীতের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গের জেলগুলিতে আজো যেমন নানা ধরণের জেলসংগ্রাম জারী আছে, পাশাপাশি জারী আছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও। যার খবর বাইরের গণতান্ত্রিক বন্ধুদের কাছে খুব একটা আসেনা। সীমা আজাদের অভিজ্ঞতা পড়ার পর আমার মাথায় প্রথম আসে যে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাও, সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও সবাইকে জানানো দরকার। পরবর্তীতে গণসাংস্কৃতি পরিষদের বুলেটিনে এ ব্যাপারে লেখার জন্য কবি অশোক চট্টোপাধ্যায় আমাকে উৎসাহিত করেন। আমি একটা রিপোর্ট আকারে সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্সি সহ বিভিন্ন জেলের রাজবন্দীদের কিছু কর্মসূচীর কথা তখন লিখি। লিখতে গিয়ে আমার মনে হয় আরেকটু বিস্তারিত লিখলে কেমন হয়? এই ভাবনা থেকেই এবারের এই লেখা।

আমরা জানি, পশ্চিমবঙ্গের জেল সংগ্রামের আছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। সেই ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকে এখানে বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীরা ও গণ আন্দোলনের কর্মীরা বারবার জেল খেটেছেন। সাতচল্লিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে পশ্চিমবাংলায় ঘটে গেছে একের পর এক গণআন্দোলন। তেভাগা আন্দোলন, বাসট্রাম ভাড়াবৃদ্ধি আন্দোলন, দু’দুটো খাদ্য আন্দোলনে, অসংখ্যা মানুষ জেলে গেছেন। গড়ে উঠেছে জেলে জেলে বন্দীদের আন্দোলন, বাইরে বন্দী মুক্তি আন্দোলন। বন্দীদের মুক্তির দাবীতে আন্দোলন করতে গিয়েও আবার অসংখ্য মানুষ জেলে গেছেন এমনকি রাজপথে প্রাণও উৎসর্গ করেছেন। যদিও দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, তৎকালীন সংশোধনবাদী নেতৃত্ব এই আন্দোলনগুলোকে ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে পরিচালিত না করে স্রেফ ভোট বাক্স ভরানোর কাজে লাগিয়েছিল। নকশাল বাড়ির আন্দোলন হলো ভারতবর্ষে প্রথম সেই আন্দোলন, যা কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে একটা সঠিক দিশা দিল। আংশিক দাবিদাওয়ার কানাগলিতে আটকে না থেকে প্রতিটি আন্দোলনেরই যে অভিমুখ হবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দিশায় পরিচালিত হওয়া, নকশাল বাড়ি তা স্পষ্ট দিক্‌নির্দেশ করল। স্বভাবতই জেল সংগ্রামের অভিমুখও গেল বদলে। আংশিক দাবীতে আটকে না থেকে জনযুদ্ধকে বিকশিত করার লক্ষ্যে জেল সংগ্রামও পরিচালিত হবে এই প্রথম এধরণের ভাবনা এলো। ফলতঃ গড়ে উঠল কিছু ঐতিহাসিক সংগ্রাম। যদিও সবকিছুই নির্ভুল ছিল তা নয়। অনেক ভুল বিচ্যুতিও হয়েছিল, বিশেষতঃ সংগ্রাম ধাক্কা খাওয়ার সাথে সাথে বিপ্লবী আন্দোলনে যখন ‘দক্ষিনপন্থী’ ও ‘বাম’ বিচ্যুতি মাথা তুলল, তখন তা স্বাভাবিক ভাবেই জেলসংগ্রামকেও প্রভাবিত করেছিল। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অন্য কোন সময় করা যাবে। কিন্তু ঘটনা হলো নকশালবাড়ি পর্যায়ে জেলসংগ্রামে নকশালপন্থী কর্মীদের আত্মত্যাগের কাহিনী কিন্তু জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বলাবাহুল্য যে কোন সংগ্রামই যেমন জন্ম দেয় নতুন নতুন শিল্প সাহিত্য, তেমনই সে সময়ও জেল সংগ্রামের সমর্থনে, রাজনৈতিক বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে, গড়ে উঠেছিল অসংখ্য কবিতা, ছোট গল্প, গণসঙ্গীত। তেমনি বেশ কিছু নাটক ও কয়েকটা সিনেমাও নির্মিত হয়েছিল। জেলের ভিতরে সমীর রায়, সৃজন সেন, মুরারী মুখোপাধ্যায়, দ্রোণাচার্য ঘোষ, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, জয়া মিত্ররা লিখেছিলেন বেশ কিছু কবিতা, বাংলা সাহিত্যকে যা যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষতঃ সৃজন সেনের “থানা গারদ থেকে মা’কে” বা সমীর রায়ের “মে দিবসে আমি আর কোন কবিতা লিখতে পারিনা বীরেন দা” – র মতো কবিতাগুলোকে তো কবিতা পাঠকরা কোন দিনও ভুলতে পারবে না। জেলের ভিতর লেখা মেঘনাথের গান বা মীনাক্ষি সেনের ‘জেলের ভিতর জেল’ বা জয়া মিত্রর ‘হন্যমান’-এর মতো উপন্যাসও জেলসাহিত্য হিসেবে পরবর্তীতে আলোড়ণ তুলেছিল আমরা জানি।একইভাবে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মনিভূষণ ভট্টাচার্য, নবারুণ ভট্টাচার্য, সব্যসাচী দেব, রঞ্জিত গুপ্ত, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি কবিরাও বন্দীমুক্তির সমর্থনে এবং বন্দীদের লড়াইয়ের সমর্থনে লিখেছেন অনেক কবিতা। বিপুল চক্রবর্তীর লেখা ‘ওরা ভগৎ সিংয়ের ভাই’ এবং অমিতেশ সরকারের ‘চাইরে চাইরে চাই মুক্তি’ বন্দীমুক্তি আন্দোলনের গানের দুটি মাইলষ্টোন।

পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকারকে কিন্তু আজো বুকের মধ্যে বহন করছেন এই প্রজন্মের রাজবন্দীরা (আবার এমন কেউ কেউ রাজবন্দী আজো জেলে আছেন যারা গত শতকের সত্তরের দশকেও রাজবন্দী হিসাবে জেলে ছিলেন, আজো আন্দোলন যখন একটা মাত্রায় বিস্তার ঘটেছে সরকার তাদের বন্দী করে জেলেই ভরে রেখেছেন)। তাই আজো জেলে জেলে রাজবন্দীদের আন্দোলন যতটা মাত্রাতে বিকিশিত হচ্ছে, সেই মাত্রাতেই কিন্তু জেলের ভিতরেও বিকশিত হচ্ছে বিপ্লবী ও সংগ্রামী শিল্প সাহিত্য।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করি। প্রথম আমি যখন পুরুলিয়ায় জেলে যাই তখন সেখানে বন্দী ছিলেন প্রবীন কমিউনিষ্ট নেতা গৌরনারায়ন চক্রবর্তী (তখনও তিনি মাওবাদী পার্টির মুখপত্র নন) এবং যুব আন্দোলনের নেতা প্রদীপ সাহা। আমরা সব একই মামলায় বন্দী ছিলাম। গৌরা দা যেমন ভাল বক্তা, অনেকেই হয়ত জানেন না, তিনি একজন সুগায়কও। প্রদীপ সাহা ছিলেন একজন পেইন্টার। ভীষণ ভাল পেনসিল স্কেচ করার জন্য তিনি জেলে জনপ্রিয় ছিলেন। জেলের নানা অব্যবস্থাকে তিনি ছবিতে ধরার চেষ্টা করতেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যত্নের অভাবে ছবিগুলি নষ্ট হয়ে গেছে। গৌরদা গান গাইতেন। বিশেষ করে তার গলায় বাসুদেব দাশগুপ্তের লেখা ‘সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখ/ হায়নার আনাগোনা’অলক স্যান্যালের লেখা ‘কারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে’ এবং পরেশ ধরের গান ‘ফুলের মতো ফুটল ভোর’ জেলে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পুরুলিয়া জেলে আমরা খুব অল্পদিন ছিলাম সেখানে থাকতে থাকতে আমরা পাঁচ-ছয় জন রাজনৈতিক বন্দী প্রায় জনা ত্রিশেক সাধারণ বন্দীকে জুটিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ‘হিরোসিমা দিবস’ পালন করেছিলাম। যেখানে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘শঙ্খচিল’ গানটা আমরা পরিবেশন করেছিলাম। এছাড়াও একবার ‘শহিদ দিবস’ পালন করেছিলাম। স্থানীয় তিনজন দাদাও আমাদের সাথে একই অভিযোগে জেলে ছিলেন, তারা তাদের দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে গান গেয়েছিলেন, ‘পুঁই খারা আর ডিংলা খারা খেয়ে মোদের ম্যুটা হয়েছে যে স্যিঠা/ আয়না রে বাবুর কাকা টুকু ধর‍্যে দে না ছ্যালাটা/ গুগলি কুড়াত্যে যাব ওই মাহাতো ঘরের গুর‍্যাটা…’

এছাড়াও জেল থেকে কোর্টে যাবার পথে আমরা যেমন নিয়মিত শ্লোগান দিতাম, তেমনই কোর্ট চত্বরে গান গাওয়া হতো। হরেক কিসিমের গণসঙ্গিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী গাওয়া হতো,শংকর শৈলেন্দ্রর লেখা ‘টুটে হো টুটে গুলামি কি বন্ধন হাজার’। এই সব গানে সবসময় মূলভূমিকা নিতেন গৌরনারায়ন চক্রবর্তী, আমাদের কাজ ছিল মূলতঃ কোরাসে গলা মেলানো।

পুরুলিয়ায় যে মামলায় আমরা অভিযুক্ত ছিলাম (এখনো মামলাটি চলছে), তাতে সহ অভিযুক্ত ছিল কণিকা দেবনাথ, এবং দীপাঞ্জন মুখার্জী। আমরা মোটামুটি একই সাথে ধরা পড়েছিলাম। কনিকা ভাল গণসংগিত গাইত। সি আই ডির তৎকালীন সদরদপ্তর ভবানীভবনের লক- আপে আমরা পাশাপাশিই থাকতাম। সারাদিন জেরা শেষে বিধ্বস্ত হয়ে আসার পর কণিকা উচ্চকণ্ঠে গণসঙ্গীত গাইত। আমরা পাশের লক-আপ থেকে তা শুনতাম। কণিকা বেশ কিছু কবিতা লিখেছিল সেই সময়। তার মধ্যে দু’একটা ভবানীভবনে এবং কয়েকটা পুরুলিয়া উইমেন্স জেলে লেখা। যা রাজবন্দীদের রচনা সংকলন(২) এ স্থান পেয়েছিল। এর মধ্যে ‘পুরুলিয়া উইমেন্স জেল থেকে’ এবং ‘পথপ্রদর্শক কাকুর উদ্দেশ্যে’ কবিতাটা দুটোর কথা আমার মনে আছে।

আমারও বাইরে টুক্‌টাক কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল। পুরুলিয়া জেলে থাকতেও লিখেছিলাম দুটো কবিতা। একটা, ‘শিরোনাম – জুলাই ২৮’ এবং অপর টা ‘গড্ডালিকার স্রোতে ভাসতে বল কেন?’

মাস তিনেকের মধ্যে পুরুলিয়া থেকে আমাকে, দীপাঞ্জনকে এবং কণিকাকে চলে যেতে হয় বাঁকুড়া জেলে। আমদের তখন যেন অনেকটা বাস্তুহারাদের মতো অবস্থা। আজ বাঁকুড়া জেল, কাল দমদম সেন্ট্রাল জেল তো পরশু ব্যারাকপুর সাবজেল, মাঝে আবার ক’দিনের জন্য ঝাড়গ্রাম সাবজেলেও কাটাতে হয়েছে। এইভাবে চলছি, ফলতঃ এই সময়টা সাংস্কৃতিক কাজকর্ম কিছুটা কম হয়েছে। পুরুলিয়া জেলে আমরা জেলপ্রশাসনের নানা দুর্নীতি নিয়ে এবং রাজবন্দীদের অধিকারের প্রশ্নে বেশ কিছু আন্দোলন করেছিলাম, যা সেই সময়ের পত্র পত্রিকায়ও খুব বড় করে নিউজ হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে আন্দোলনও তেমনভাবে করার সুযোগ হচ্ছিল না। একইভাবে লেখালখি করার সুযোগ কমছিল। শুধু একটা ছোট গল্প সেই সময় আমি লিখেছিলাম মনে আছে। গল্পটার নাম ছিল ‘শিশুদিবসের পর দিন’। এছাড়া যেহেতু পুরুলিয়া কোর্ট চত্বরে মিডিয়ার মাধ্যমে অনিল বিশ্বাসকে (তৎকালীন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক) মাওবাদের প্রশ্নে এবং তথাকথিত বিশ্বায়নের উন্নয়নের প্রশ্নে খোলা বিতর্কের আহ্বান করেছিলাম ফলতঃ এই সংক্রান্ত কিছু নিবন্ধ লেখার কাজও তখন করেছিলাম। দমদম সেন্ট্রাল জেলে আমাদের সাথে আলাপ হয় স্বপন মন্ডলের সঙ্গে। সুন্দরবন অঞ্চলের বাসিন্দা স্বপনদা একজন কবি ও সুরকার। মজার একটা ঘটনা মনে আছে, দীপাঞ্জন মুখার্জী, আমার সাথেই সহ অভিযুক্ত এক সাথী, একদিন আমায় নিয়ে স্বপনদার ঘরে গেল। স্বপনদাও যেহেতু রাজদ্রোহীতার অভিযোগে বন্দী তাই বাইরে আলাপ না থাকলেও ভিতরে যাবার পর তার সাথে বন্ধুত্ব হতে আমাদের সময় লাগেনি। দীপাঞ্জন সেদিন স্বপনদার অনুরোধে একটা গণসঙ্গীত শুনিয়েছিল, সর্বহারার রক্তে ওরা লাল পতাকা করে লাল/ বারবার প্রমান করেছে, ওরা জোতদারের দালাল/ ওরা পুঁজিপতির দালাল’। পরে জানা যায় গানটির স্রষ্টা স্বয়ং স্বপনদা!

এমনি করেই দিন কাটছিল। হঠাৎ করেই একদিন ছাড়া পেয়ে যাই এবং অল্প ক’দিন পরেই আবার গ্রেপ্তার। এবার ঠিকানা কৃষ্ণনগর জেল। এখানে থেকেছিলাম পাঁচবছর দু’মাস। এখানে সান্নিধ্যে আসি আরেকজন প্রবীণ কমিউনিষ্ট নেতা চন্ডি সরকারের। এছাড়াও এখানে ছিলেন জাকির হুসেন, জিলাই শেখ, মন্টু চ্যাটার্জী, তোফাজ্জেল মন্ডল সহ প্রথমে ১২ জন রাজবন্দী। পরে আসেন আরেকজন প্রবীন নেতা অজিত চক্রবর্তী। এছাড়াও এলো বাপি দেবনাথ, প্রশান্ত দাস, প্রদীপ চ্যাটার্জী, রীনা সরকার, লতা মুর্মু সহ আরো বারো তেরো জন। আরেকজন প্রবীন কমিউনিষ্ট নেতা তরুণ সাহার সাথেও ওই সময় একই ঘরে, এক সাথে প্রায় আড়াই বছর থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। তৃণমূলের জমানায় জেলের দ্বিতীয় শহীদ হলেন কমঃ তরুণ সাহা। প্রেসিডেন্সি জেলে পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের শাসনে, কার্যতঃ বিনা চিকিৎসায় তাঁর মৃত্যু হয়। তরুণদা ছিলেন একজন আপাদমস্তক সংস্কৃতমনা মানুষ। তিনি গানও গাইতে পারতেন না, কবিতাও লিখতে পারতেন না, কিন্তু দুটোর প্রতিই ছিল তার অদ্ভুত অনুরাগ। তার খাতা এবং ডাইরিগুলোতে তিনি সুযোগ পেলেই গণসঙ্গীত ও কবিতা টুকে রাখতেন। তার একটা এরকম গানের খাতা এখনো রাজবন্দীদের কাছে সুরক্ষিত আছে। বস্তুতঃ সেটা আজো বিভিন্ন সঙ্গীত চর্চায় রাজবন্দীদের সাহায্য করে থাকে। কৃষ্ণনগর জেলে আমরা অসংখ্য আন্দোলন সংগঠিত করেছিলাম। তার মধ্যে আংশিক দাবিদাওয়ার আন্দোলনও যেমন ছিল তেমনই ছিল বেশ কিছু রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার আন্দোলনও। এর মধ্যে ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রাম গণহত্যার সময় ১০০ জন সাধারণ বন্দীকে নিয়ে রাজবন্দীদের অনশন কর্মসূচী এবং পরবর্তীতে তথাকথিত ‘অপারেশন সূর্যোদয়’ এর নামে আবারও নন্দীগ্রামে গণহত্যা কর্মসূচীর প্রতিবাদের প্রায় সারে চার’শ সাধারণ বন্দীকে নিয়ে অনশন কর্মসূচী এবং জঙ্গল মহলে যৌথ অভিযানের প্রতিবাদে রাজবন্দীদের নয়দিনের অনশন কর্মসূচী, যাতে শেষদিন শতাধিক সাধারণ বন্দীও অংশ নেয় – তা উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য যে লালগড়ে যৌথবাহিনী প্রত্যাহারের দাবীতে রাজবন্দীদের অনশন আন্দোলন হয়েছিল দু’বার। প্রথমবার বন্দীদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন লেখিকা জয়া মিত্র এবং দ্বিতীয়বার এসছিলেন কবি সব্যসাচী দেব। এছাড়াও দুবারই আমরা পাশে পায়েছিলাম কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কৃষ্ণনগর জেলে পাঁচবছরে প্রায় ৬৪ টা অনশন কর্মসূচিতে আমি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলাম। এছাড়া ২৬শে জানুয়ারির দিন কালো ব্যাজ পরানোর কর্মসূচীও আমি থাকাকালীন একবার নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতা শুধু জারীই ছিল না, বস্তুতঃ তা আরো তীব্র আকার ধারন করেছিল।

কৃষ্ণনগর জেলে থাকাকালীন ধারাবাহিকভাবে জেলের ভিতর আমরা বিভিন্ন কর্মসূচী নিতাম। ২৮শে জুলাই শহীদ দিবস পালন করা হতো; মে দিবস উদ্‌যাপন করা হতো; লেনিন এবং মাওয়ের জন্মদিন পালন করা হতো; ৮ইমার্চ নারী দিবস পালন করা হতো, ১৫ই আগষ্ট এবং ২৬শে জানুয়ারি এই ভূয়া স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকে উন্মোচিত করে কর্মসূচী নেওয়া হতো। এই দুটি দিন অন্যান্য কর্মসূচী সাধ্য মতো নেয়ার পাশাপাশি আমরা অবশ্যই সরকারি কর্মসূচী বয়কট করতাম এবং অনশনে সামিল হতাম। এছাড়াও বাইরের অধিকার আন্দোলনের সাথীদের আহ্বনে সাড়া দিয়ে আমরা ভগৎ সিং ও যতীন দাসের আত্মোৎসর্গ দিবসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে শুরু করি। কমিউনিষ্ট বিপ্লবী পার্টি সিপিআই (মাওবাদী) কোন বন্ধ ডাকলে আমরা সেই দিনটাতে ভুখ হরতাল করতাম।

কৃষ্ণনগর জেলে দীর্ঘদিন থাকার কারণে আমার নিজেরও কবিতা ও ছোট গল্প লেখার চর্চাটা একটু বেশী মনোযোগ দিয়ে করার সুযোগ ঘটে, তাছাড়া ওখানে অন্যান্য সাথীদের মধ্যেও এব্যাপারে বেশ উদ্যোগ ছিল। বিশেষতঃ শুরুর দিকে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অতীন চ্যাটার্জীর(মন্টু) কথা সবার আগে বলতে হবে। তার জানাছিল অল্প ক”টাই কবিতা, কিন্তু সেগুলো তিনি বেশ ভালই আবৃত্তি করতেন। এছাড়াও বন্দী জীবনের যন্ত্রণা নিয়ে এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি বেশ কটি কবিতা ও গল্প লিখেছিলেন। লিখেছিলেন দু’তিনটে প্রবন্ধও। এর মধ্যে ‘আমার বাইরে গিয়ে’ কবিতাটার কথা আমার আজো বেশ মনে আছে। পেশায় তাঁত শ্রমিক মন্টুদার বয়স প্রায় পঞ্চান্নর কাছাকাছি ছিল। আগে তিনি কখনো সাহিত্য চর্চার সাথে যুক্তও ছিলেন না, তবে গণআন্দোলনের সাথে যুক্ত হবার সুবাদে এব্যাপারে অল্পবিস্তর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, জেলের রাজনৈতিক পরিবেশে এসে তার স্ফুরণ ঘটে। আমরা যখন আমাদের নিজস্ব বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম, তখন গানে সামিল হতেন জিলাই শেখ, মন্টু চ্যাটার্জী, মনিরুল মোল্লা এবং স্বপন সূত্রধর। এদের মধ্যে স্বপনের গলাটা বেশ ভাল ছিল। স্বপন এখনো বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী আছেন। তার গলায় ‘কমরেড বলে ডাক দিলে কেউ, কমরেড বলে ডাক’ আর ‘যদি গতর খেটেও ভাত কাপড় আর কাজ না মেলে’ গান দুটো আমার কানে এখনো বাজে। বছর খানেক পরে কৃষ্ণনগর জেলে প্রশান্ত, বাপী, প্রদীপ, গুপি দাস, রীনা, লতা, চন্ডী মন্ডল, অজিত চক্রবর্তী, এবং রতন মন্ডলরা রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এলেন। এদের প্রত্যকেই জেলের ভিতর শিল্প সাহিত্য নিয়ে কমবেশী চর্চা করতেন, দেখেছি। প্রথমেই এক্ষেত্রে প্রশান্ত দাসের কথা বলতে হয়। প্রশান্তকে একজন আপাদমস্তক শিল্পী বলা চলে, যে নাকি গণসঙ্গীতেও সাবলীল আবার রাহুল দেব বর্মনেও সাবলীল। উস্তাদ গুলাম আলীর ‘চুপকে চুপকে রাত দিন’ও গাইতে পারে আবার গুরুদাস পালের, ‘হায়রে মৃত্যু কালে পাপীতো কৃষ্ণ বলে না’ – এই গানও গাইতে পারে। মূকাভিনয়ও করতে পারে আবার ছবিও আঁকতে পারে। নাটক লিখতে পারে,পরিচালনা করতে পারে, অভিনয় করতে পারে। বলা বাহুল্য আগে থেকেই আমরা সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের সক্ষমতার কিছু অভাব ছিল, যা প্রশান্ত সহ বাকি সাথীরা আসায় পুষিয়ে গেল। সাধারণত আমরা দুভাবে সাংস্কৃতিক কর্মসূচিগুলি নিতাম। কিছু সাংস্কৃতিক কর্মসূচী ছিল একেবারে রাজনৈতিক কর্মসূচীর অঙ্গ, আরেক ধরণের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ছিল কিছুটা ব্যাপক অর্থে প্রগতিশীল হলেও তাতে বিপ্লবী গণসাংস্কৃতিক কার্যাবলীগুলো থাকত না। যদিও আমরা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১৫ই আগষ্ট বা ২৬শে জানুয়ারির মতো অনুষ্ঠানগুলো সবসময় বয়কট করতাম, কিন্তু পাশাপাশি রবীন্দ্র জয়ন্তীর মতো অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহনই শুধু করতাম না, মূলতঃ এই অনুষ্ঠানগুলোকে আমরাই পরিচালনা করতাম। অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে দিয়ে আমরা সমসময়কে ধরবারও চেষ্টা করতাম। যেমন সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনকে মাথায় রেখে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে একবার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি আবৃত্তি করানো হয়। একইভাবে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামকে মাথায় রেখে, অর্থাৎ শাসকের জমি লুঠকে মাথায় রেখে নাটক প্রশান্তর লেখা নাটক ‘আজব দেশের গল্প’ মঞ্চস্থ করা হয়, কিংবা কিংবা কন্ধমালে খ্রীষ্টানদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমনের প্রতিবাদে প্রশান্তরই লেখা নাটক – ‘লাশ’ – মঞ্চস্থ হয়েছিল। এছাড়াও আরো তিনটে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। প্রশান্তই যেগুলির নাট্যরূপ দিয়েছিল। সেগুলো হল রবীন্দ্রনাথের দেনা পাওনা গল্প অবলম্বনে লেখা একটি নাটক। রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিস্কার’ কবিতাটাকে নাট্যরূপ দেয়া হয়েছিল, যেখানে চমৎকারভাবে তত্ত্ব ও অনুশীলনের সম্পর্কটাকে ধরে দেখানো হয়েছিল শ্রমজীবী জনতার শ্রম এবং অভিজ্ঞতা জনিত জ্ঞানকে কিভাবে অভিজাতশ্রেণী করায়ত্ত করে। এছাড়াও তত্ত্ব ও অনুশীলনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে নিয়ে পরে আরো একটিও নাটক প্রশান্তর নির্দেশনায়ই মঞ্চস্থ করানো হয়, নাটকটির নাট্যরূপটিও তারই দেয়া। নাটকটি হলো বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই। নাটকটিতে অন্ধ্রের বিপ্লবী গায়ক গদর এবং লোককবি গুরুদাস পালের গানের সুর ব্যবহার করা হয়েছিল। মঞ্চ সজ্জার জন্যও নাটকটি বিশেষ প্রশংসা পেয়েছিল কারণ মঞ্চে স্পেশাল এফেক্টের সাহায্যে নদীর আবহ তৈরি করা হয়েছিল, যার পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল প্রশান্ত ও অন্যান্য নাটকদলের সদস্য সহবন্দীদের মস্তিষ্কপ্রসূত। নাটকগুলিতে মঙ্গল মন্ডল, মন্টু চ্যাটার্জী, স্বপন সূত্রধর, মনিরুল মোল্লা এবং রীনা সরকার খুব ভাল অভিনয় করেছিল। কৃষ্ণনগর জেলে আমার দেখা আরেকজন শিল্পী মানুষের নাম হলো পরেশ তিরকি। আদিবাসী এই ক্ষেতমজুর মানুষটি রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে আজো জেলে আছেন। চমৎকার বাঁশী বাজাতেন আমাদের পরেশদা। প্রচন্ড অর্থকষ্টের মধ্যে রয়েছে পরেশদার পরিবার, গণতান্ত্রিক মানুষরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে ভাল হয়।

আগেই বলেছি একেবারে শুরু থেকেই কিছু কিছু কর্তৃপক্ষের অনুষ্ঠানেও আমরা অংশ নিতাম, তবে নিজেদের রাজনীতিকে ছাড় দিয়ে কখনোই নয়। এইসব কাজগুলো করতে গিয়ে কখনো কখনো রামকৃষ্ণ মিশন বা খ্রীষ্টান মিশনারিদের অনুষ্ঠানেও আমরা আমাদের মতো করে অংশ নিয়েছিলাম। যেমন রামকৃষ্ণ মিশনের দেয়া একটা বোর্ডেই আমরা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করতাম। পত্রিকার নামকরণটা মিশনের মহারাজই করেছিলেন – ‘উত্তিষ্ঠত’। তবে পত্রিকা পরিচালনায় স্বাধীনতা থাকায় আমরা অনেকেই তাতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম, আবার সাধারণ বন্দীরাও ছিল, তবে পত্রিকার বিষয়বস্তু নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের উপরই তারা নির্ভর করতেন। পত্রিকাটি ভীষণ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। প্রায় ৪৯ টা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যেই আমরা তাতে তিনবার কুসংস্কার বিরোধী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম, যেগুলি ছিল মূলত নাস্তিক্যবাদী লেখা-পত্তর। তাছাড়াও বিচারের দীর্ঘসূত্রীতা থেকে শুরু করে বিচার নামক প্রহসন নিয়ে নানা লেখা কখনো কখনো থাকত। জেলের মধ্যে খেলাধূলা পরিচালনার উদ্যোগও আমাদের হাতেই থাকত। তবে রামকৃষ্ণ মিশনকে সামনে রেখে বিজ্ঞানমেলার উদ্যোগ নেয়ার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল। দুবার তা অনুষ্ঠিতও হয়েছিল জেলের ভিতরে, কিন্তু এ ব্যাপারে উদ্যোগকে খুব একটা ধরে রাখা যায় নি(রামকৃষ্ণ মিশনের থেকে বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারে খুব একটা সাহায্য না পাওয়াটাই স্বাভাবিক,কারণ রামকৃষ্ণ,বিবেকানন্দ দুজনেই দাঁড়িয়ে আছেন বিজ্ঞানভাবনার বিপরীত অবস্থানে)। প্রশান্ত ভাল ছবি আঁকত আগেই বলেছি, এছাড়া কিছু সাধারণ বন্দীও ভাল ছবি আঁকত। এদের মধ্যে নির্মল বলে এক ছেলের কথা মনে আছে, যে ছবিও আঁকতে পারত, মাটির পুতুলও বানাতে পারত। ছেলেটি পরে স্বীকার করেছিল যে বিপ্লবী বন্দীদের সান্নিধ্যে এসেই তার এই সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটেছে।

প্রশান্ত ছাড়াও প্রদীপ চ্যাটার্জী ও গুপী দাস বেশ ভাল গল্প লিখত। প্রদীপের সমসাময়িক বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লেখার হাতও বেশ ভাল,এবং জেলে সে নানা বিষয় লেখালেখি করেও। অজিত চক্রবর্তী খুবই ভাল গল্প লেখেন। সংগ্রামী জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি যথেষ্ট ঋদ্ধও। তার গল্পে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে। বাপী দেবনাথ একজন ভাল গণসঙ্গীত শিল্পী। বিশেষ করে তার গলায় অজিতপান্ডের কথায় ও সুরে, ‘তরাই জ্বলছে গো জ্বলছে আমার হিয়া’ এবং সমীর রায়ের লেখা ‘জননী গো কাঁদো আরো কাঁদো তুমি শত শহিদের মা’ শুনলে মনে রেখাপাত করে। কৃষ্ণনগর জেলের মহিলা সেলের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম ওখানকার মহিলা রাজবন্দীদের উদ্যোগেই সংগঠিত হয়। আগে মহিলাদের জন্য আলাদাভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো, পরবর্তীতে প্রশান্তর পরিচালিত নাটকগুলির উৎকর্ষতা এবং রাজবন্দীদের সুব্যবহারের প্রতি আস্থা রেখে নারী-পুরুষ একসাথে যৌথ মহড়া করে নাটক পরিচালনার ছাড়পত্রও দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। রীনা সরকার এবং লতা মুর্ম্মু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিত। এছাড়া রীনা কিছু গল্প, কবিতাও লিখেছিল, তার মধ্যে ‘এরকম তো কতই হয়’(গল্প) এবং ‘মা’, ‘ডাইরি’, ‘পিতৃতন্ত্র’ কবিতা তিনটে বাইরের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তার কবিতাগুলোর মধ্যে ‘জঙ্গল মহল’ ‘প্রেরণার মুখ’ কবিতাদুটোও বেশ ভাল।

আমার তিনটে কবিতার বই যখন প্রকাশ পায় তখন প্রতিবারই আমি জেলে। এর মধ্যে ‘গণপ্রতিরোধ মঞ্চে’র উদ্যোগে প্রকাশিত ‘এই সংলাপ ব্যক্তিগত’ নামক কবিতার বইটির এবং নিউ হরাইজন বুক ট্রাস্ট প্রকাশনার প্রকাশিত ‘প্রতীক্ষায়, প্রসব যন্ত্রণায়’ বইটির প্রতিটি কবিতাই আমি কৃষ্ণনগর জেলে লিখেছিলাম। তৃতীয় দফার জেলে থাকাকালীন আমার তৃতীয় বইটি প্রকাশিত হয় ‘র‍্যাডিক্যাল’ থেকে। বইটির নাম ‘ভিজে যাওয়া কবিতা খাতায়’। এই বইটিতেও তৃতীয় দফার জেলে থাকাকালীন লেখা কয়েকটা কবিতা স্থান পেয়েছিল। স্থান পেয়েছিল কৃষ্ণনগর জেলে লেখা কিছু কবিতাও।

এবার প্রেসিডেন্সী জেলে গিয়ে আবার পুরানো জেলের সাথী গৌর নারায়ন চক্রবর্তী, প্রশান্ত দাস, প্রদীপদের সাথে দেখা হলো, এছাড়াও অনেক কমরেড ছিলেন। এদের মধ্যে দীনেশ ওয়াংখেরে এবং দীপক কুমার বলে দুই নতুন সাথীর সাথে আলাপ হলো যারা যথেষ্ট সংস্কৃত মনস্ক। দীনেশ ভাল গান গায়। বিশেষতঃ পস্কো আন্দোলন থেকে উঠে আসা গান ‘গাও ছোড়ব নাহী’ গানটি খুব সুন্দর শোনায় তার গলায়। ভাল গান গায় বাপি মুদি নামক একজন প্রতিবন্ধী যুবকও, যার শতকরা ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি চলে যাওয়া স্বত্বেও এস টি এফ এবং এন আই এ’র যৌথ উদ্যোগে (পড়ুন কেন্দ্র সরকার ও রাজ্যসরকারের যৌথ উদ্যোগে) যাকে একজন ভয়ংকর ‘মাওবাদী’ বলে জেলে আটকে রাখা হয়েছে।

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ মধুসূদন মন্ডলও আজ দীর্ঘদিন হলো জেলে আছেন, বামফ্রন্ট আমলের মিথ্যা মামলাকে সত্যি প্রমান করতে বর্তমান তৃণমূল সরকার আজ দায়বদ্ধ কিনা তাই গৌরাদা, পতিতদা, সন্তোষদা কিংবা প্রশান্ত-প্রদীপ-মধুদারা জেলে আছেন। তবে তাঁরা জেলজীবনে মোটেই ভেঙে পড়েন নি, তার প্রমান হলো তাদের সৃষ্টি করা বিভিন্ন গান, কবিতা গল্প, নাটক। জানিয়ে রাখা ভাল এখনো প্রেসিডেন্সী সহ বিভিন্ন জেলে রাজবন্দীরা তাদের সংগ্রাম জারী রেখেছে, ফলতঃ স্বাভাবিকভাবেই জারী আছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও। প্রতিটি ঘটনাতেই বন্দীরা তাদের প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন, নানা উপায়ে। কখনো যেমন প্রতিবাদে অনশন করেন, লক আপ বয়কট করেন তেমনই আবার দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করে তারা তাদের প্রতিবাদকে ব্যক্ত করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবাদকে ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্সী জেলে রাজবন্দীরা পরিচালনা করছে তাদের নিজস্ব গণরাজনৈতিক পত্রিকা ‘মুক্তির বার্তা’। প্রেসিডেন্সী জেলের শহিদ তরুণ সাহার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকিতে যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। আমি দেখে আসার আগে অবধি পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। বলাবাহুল্য আগামী দিনেও তাদের এই প্রয়াস জারী থাকবে। এই পত্রিকার মধ্যে দিয়ে অনেক নতুন নতুন রাজনৈতিক কর্মীর কবিতা গল্প ইত্যাদী লেখায় হাতেখড়ি হয়েছে। বিমল মল্লিক এমনই একজন কবি। বিমল মল্লিকের ষোলটা কবিতা এবং সুনীল মন্ডলের দশটা কবিতা নিয়ে র‍্যাডিক্যাল থেকে প্রকাশিত হয়েছে একটি কবিতার ছোট বুকলেট,‘বন্দী জীবনের মুক্ত কবিতা’ শিরোনামে। কবিতাগুলোর বিষয়বস্তুর মধ্যে আছে বন্দী জীবনের যন্ত্রণা, অভিজ্ঞতার কথা। আছে সমসময়। আফজল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বন্দীরা একটি পথনাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন প্রেসিডেন্সী জেলের সেলের মধ্যেই, যাতে অনেক সাধারণ বন্দী সহ জেহাদী বন্দীও দর্শক হিসাবে অংশ নিয়েছিলেন। অর্নব, অভিষেকদের আগে থেকেই কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল। স্বাভাবিকভাবেই বন্দীজীবনে তার ছেদ পড়েনি। ‘নকশালবাড়ি’, ‘কামদুনি২০১৩’, ‘গিনতি’ অভিষেকের এমনই তিনটি কবিতা। অর্নব দাম(বিক্রম) কবিতার সাথে লিখছে সুন্দর সুন্দর ছোট গল্পও। নতুন পৃথিবীর গল্প। ইতিমধ্যেই ‘লাথ খোর’, ‘ডোডোর আকাশ’, ‘পরিবর্তনপুরের কিস্যা’ গল্পগুলি তিনটে অনুপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তার লেখা আরো কয়েকটা গল্প হলো ‘হড়পা বান’ পুরুলিয়ার হড়পা বানে ডুবে মারা গেছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র-ছাত্রী। তারা বেড়াতে বেরিয়েছিল। তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট হইচই হয়। এই ঘটনার আবহে পুরুলিয়ার আদিবাসী মূলবাসী সমাজের মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবনে কিভাবে হড়পা বান আসে জঙ্গল মহলে তা ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে অর্নব। একজন মানুষের সারাজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা গল্প ‘মানুষের মহাকাব্য’। ‘যুধিষ্টির ভাইরাস’ একটা সম্পুর্ণ নতুন ধরণের গল্প, যেখানে একটা নতুন ভাইরাসের আবির্ভাব হয়েছে, যাতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ সব সত্যি কথা বলে ফেলছে আর সেই সত্যের অভিঘাতে ব্যবস্থা রসাতলে যেতে বসেছে। ভাইরাসটির নাম ‘যুধিষ্টির ভাইরাস’। অবশেষে তার ভ্যাক্সিন আবিস্কার হলো। নির্মূল করা গেল ভাইরাসটিকে। এবং সমাজের কেষ্টবিষ্টুরা হাঁফ ছেড়ে বাচলেন। শুধু আশাহত হলেন কিছু খেটেখাওয়া মানুষ।

গল্প লেখার পাশাপাশি অর্নবের কবিতা লেখার হাতটিও বেশ ভাল। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কবিতা জেলের চার দেয়ালে থেকেও সে লিখে ফেলেছে। এমনই একটি কবিতা সদ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক সমসময়’ সাহিত্য ম্যাগাজিনে। অনেক দূর পুরুলিয়া কোর্ট থেকে প্রেসিডেন্সি জেলে ফেরার সময় মাথায় এসেছিল এই কবিতা । ‘শূন্যপুরী’ শিরোনামে লেখা কবিতাটা পুরোটাই তুলে দিলাম।

“রাত্রি বারোটা হলে
এ শূন্যপুরীতে
তোপ বারোবার।
হেমন্তের হিম রেখে
ঘুম পরী ফিরে যায়,
সাগরে জোয়ার।

বহুদূরে রাজপথে
বহমান স্রোতখানি
বড় স্বপ্নহীন।
তবুও ক্রমশ জাগে,
কপালে টি’ দিয়ে যায়
ডুবে যাওয়া দিন।

শ্বাসপ্রশ্বাসগুলি
হঠাৎ চমকে দিলে
বুকে তুলি পাল।
বারান্দায় ওঁত পেতে
যদিও সতর্ক থাকে
শিকারী বেড়াল।

মগ্ন জলাভূমি থেকে
কিছু কানাকানি নিয়ে
হাওয়া আসে ছুটে।
শিয়রে অলীক শান্তি
ভেঙে খানখান হলো
সামরিক বুটে”।

অর্নবের মতোই আরো একজন সৃজনশীল সাথী হলেন দীপক কুমার। ছত্তিশগড় থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মাওবাদী নওজোয়ান। যেমন সুন্দর কবিতা লেখেন, তেমনই চমৎকার তার গদ্যের হাত। তার ‘মার্শাল’ সিরিজের হিন্দি কবিতাগুলি অনবদ্য। তার স্ত্রী রেখা রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায় থেকে বেকসুর খালাস হয়েছেন ক’দিন আগেই। ঘরে আছে তার ছোট্ট বাচ্চা ফুটুফুটে কন্যাসন্তান। তার সাথে সে ফোনালাপও করে থাকে কখনো সখনো। সেই অনুভূতিগুলোও দীপকের কবিতায় প্রতিফলিত হয়। দীপক ছবি আঁকেন ও পোষ্টার প্রদর্শনীর জন্য কবিতাও সংগ্রহ করেন চমৎকার। বিপ্লবী কবি পাসের কবিতার সাথে অনেক আগেই শ্রদ্ধেয় কবি কাঞ্চন কুমার বাংলার পাঠকদের আলাপ ঘটিয়েছেন। দীপক কুমারের মাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনলাম আরেক কবির কবিতার সাথে। তিনি ধুমিল। দীপকের থেকে সংগ্রহ করে আমি টুকে রেখেছি আমার খাতায় ধুমিলের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন –

“এক হী সংবিধানকে নীচে
ভুখ সে রিয়াতি হুই ফ্যায়েলি হাথেলি কা নাম
‘দয়া’ হ্যায়
অউর ভুখ মে
তানি হুই মুঠ্‌ঠি কা নাম
‘নকশালবাড়ি’ হায় …”

প্রেসিডেন্সি জেলে আরেকজন কবিমনের সাথে আলাপ হলো। তিনি হচ্ছেন গণ আন্দোলনের সুবাদে আমার অতি পরিচিত মধুদা। মধুসূদন মন্ডল। তার সৃষ্টিশীল মনের সাথে আমার জেলজীবনের আগে পরিচয় হয়নি। এ আমারই ব্যর্থতা। মধুদা গান লেখে, সুর দেয়। কবিতাও লেখে চমৎকার। ছবিও আঁকে। অল্প বিস্তর বাঁশীও বাজাতে পারে। অথচ কোনটিতেই তার প্রথাগত তালিম নেই। তবে একসময় ‘সব পেয়েছির আসর’-এ যুক্ত হবার সুবাদে কিছু সাধারণ ধারনা তার ছিল। বাইরে থাকতেই গণসঙ্গীতের প্রতি এবং নাটক, নাচের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। কিন্তু আঁকা শেখার প্রতি আগ্রহ তার নতুন। কোন প্রথাগত তালিম ছাড়াই মধুদা ছবি আঁকেন। বিশেষ করে পেন্সিল স্কেচ দেখলে বোঝা যাবে না যে মানুষটার কোনদিন এব্যাপারে প্রথাগত তালিম হয়নি! কিষেনজী, শশধর মাহাত থেকে ভগৎ সিংয়ের পোট্রেট আঁকায় যেমন তিনি সাবলীল, তেমনই সংবাদ পত্রের ছবি দেখে আঁকেন নবারুণ ভট্টাচার্য কিংবা সরোজ দত্ত’র পোট্রেটও। অন্যান্য কবিও কল্পনা করে তিনি আঁকেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় প্রতিবাদের এই মুখ মধুসূদন মন্ডল ( যাকে সে অঞ্চলে সবাই নারান নামেই চিনত) আজও জেলে, যদিও এই আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আমরা সবাই জানি। আজো শাসকদল ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রাম গণহত্যার দিনটিকে স্মরণ করে, কিন্তু সেদিন বহু মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বাজী রেখেছিল যে মানুষটা, সেই মধুদাকে কিন্তু সচেতন ভাবে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে এই শাসকদলের নেতারাই! শুধু মধূদাই নয় তার সাথে একই সময় ধরে বন্দী শচীন ঘোষাল, রাধেশ্যাম গিরি, সিদ্ধার্থ মন্ডলরাও নন্দীগ্রাম আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এরা সবাই কিন্তু আজো জেল বন্দী! মধুদার প্রসঙ্গে ফিরি। মধুদা ছবি আঁকার পাশাপাশি গানও লেখে। সাম্প্রতিক তার ঝাপান গানের সুরে লেখা গান – ‘কি হলো কি হলো মাগো/ নারীর সন্মান কোথায় গেল’ – সাম্প্রতিক কালের কামদুনি, মধ্যমগ্রাম কান্ড নিয়ে লেখা গান। একই ভাবে নির্বাচন ব্যবস্থার অসারতা নিয়ে লেখা তার গান – ‘ভোট বাবুদের ভোট নাই’, কিংবা এই ক্ষমতা হস্তান্তর আসলে যে টাটা বিড়লাদেরই স্বাধীনতা, দরিদ্র মানুষদের যে আদৌ কোন স্বাধীনতা নেই, এই অনুভূতি নিয়ে গান – ‘কেঁদে কেঁদে দিশেহারা’। গানগুলি কিন্তু কথায় ও সুরে বেশ শক্তিশালী, পাশাপাশি তা সমসাময়িক ঘটনা গুলোকেও স্পর্শ করে।

প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক বন্দীরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী প্রতিবাদে সামিল হয় তা আগেই বলেছি। যেমন নারীর উপর সাম্প্রতিক ঘটে চলা যৌন হিংসার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্সি জেলের রাজবন্দীরা তাদের দেয়াল পত্রিকা ‘মুক্তির বার্তা’য় একটা বিশেষ ‘নারী’ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। যেখানে সাম্প্রতিক ঘটনার পাশাপাশি, নারীদের উপর যৌন নির্যাতনের আর্থসামাজিক উৎস নিয়ে যেমন চর্চা করা হয়েছিল, তেমনই চর্চা হয়েছিল নারী মুক্তির দিশা নিয়েও। এছাড়াও শহীদ দিবসেও বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে কমরেডরা শতাধিক শহিদের তালিকা প্রস্তুত করে তা দেয়ালে টাঙিয়েছিল। সিপিআই(মাওবাদী) পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দিনটিতে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল একটা দেয়াল পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা, যে সংখ্যার বিষয় ছিল ‘প্রতিবন্ধকতা’। এছাড়াও শহীদ দিবস উপলক্ষে জেলে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পোষ্টার প্রদর্শণী করা হয়েছিল। একইভাবে ৮ই মার্চ প্রেসিডেন্সি, আলিপুর সহ বিভিন্ন জেলে নারীদিবস পালন করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে কমরেড পতিতপাবন হালদার ও গৌরনারায়ন চক্রবর্তীর পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে একটা খোলা চিঠি দেয়া হয়। যা বাইরের বন্ধুদের হাতেও পাঠানো হয়। কর্তৃপক্ষের হাতেও দেয়া হয়। নারী দিবসের দিন পোষ্টার প্রদর্শণী করা হয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়। এছাড়াও নারী দিবসের তাৎপর্য ও আজকে তার প্রাসঙ্গিকতা কতটা, তা নিয়ে বক্তারা বক্তব্য রাখেন। আমি জামিনে ছাড়া পাই এ বছর ২৩শে মার্চ ভগৎ সিংয়ের আত্মবলিদান দিবসের কিছুদিন আগেই, তখন জেলে ২৩শে মার্চ দিনটা কিভাবে সংগ্রামী দিন হিসাবে পালন করা যায় তার প্রস্তুতিই চলছিল। এই উপলক্ষ্যে গানের মহড়াও চলছিল। চলছিল পোষ্টার প্রদর্শণীর প্রস্তুতিও। এছাড়াও শহিদ কবি সরোজ দত্তের শতবর্ষকে স্মরণ করে একটা পোট্রেট আঁকার কাজ চলছিল। যে পোট্রেটটির পাশে ‘কোন এক বিপ্লবী কবির মর্ম কথা’ কবিতাটি লিখে ক্যালেন্ডারের মতো তা ঝুলিয়ে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে আলিপুর জেলের বন্দীরাও নারী দিবসের দিন গলায় পোষ্টার ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং জেলের ওয়ার্ডগুলিতে ঢুকে সাম্প্রতিক কালের নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন, যাতে সামিল ছিলেন ভেঙ্কটেশ রেড্ডি, ছত্রধর মাহাত, রাধেশ্যাম গিরি, শচীন ঘোষালরা। ভেঙ্কটেশ রেড্ডির আঁকা কার্ল মার্কসের পোট্রেট তো সংবাদ মাধ্যমের মারফত আমরা অনেকেই দেখেছি।

মেদিনীপুর জেলে বসে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন রাজা সরখেল। প্রসূন চ্যাটার্জীরও বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে এদের দুজনকেই মিথ্যা অভিযোগে ‘পরিবর্তিত শাসক’ জেল ট্রানস্ফার করেছে। রাজা সরখেলকে হুগলিতে আনা হয়েছে। প্রসূনকে পাঠানো হয়েছে সুদূর পুরুলিয়া জেলে। যদিও সেখানে বর্তমানে তার কোন মামলাও নেই। শোনা যাচ্ছে প্রসূনকে ঠিকমতো বইপত্র পড়তে দেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া দূরত্বের কারণে তার সাথে পরিবার বা বন্ধুদেরও দেখা করার বিষয়টা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রসূন বা রাজারাই শুধু নয়, জেলখানায় কলম ধরেছেন কল্যান মাহাত, ভোলানাথ মাহাত বা সুবোধ মাহাতরাও। ইতিমধ্যেই তাদের কিছু কবিতা বন্দীবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে। ‘মুক্তিচাই’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সুদূর ওড়িষ্যা থেকে পাঠানো শিলাদিদির চিঠি। যাতে সেখানকার জেলের অবস্থার চমৎকার বর্ণনা আছে। পিপলস্‌ মার্চ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিষেনজিকে নিয়ে তার আরেকজন সহযোদ্ধা, অমিতাভ বাগচির কবিতা ‘সংসপ্তক’।

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভাল, ‘বন্দীবার্তা’, ‘মুক্তি চাই’, ‘ইক্ষন’, ‘পিপলস্‌ মার্চ’, ‘সাংস্কৃতিক সমসময়’, ‘এখন প্রতিরোধ’-এর মতো পত্রিকাগুলি নিয়মিত রাজনৈতিক বন্দীদের লেখাগুলি বিভিন্ন সময় প্রকাশ করে তাদের দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে।

শিল্প, সাহিত্য কোন শ্রেণী নিরপেক্ষ বৌদ্ধিক চর্চার বিষয়বস্তু নয়। যারা এমনটা দাবী করেন, তারা হয়ত জানেন না তাদের এই দাবীটারও একটা শ্রেণী অবস্থান আছে। অবশ্যই তা হলো শাসকশ্রেণীর হাতকে শক্তিশালী করার শ্রেণী অবস্থান। কমিউনিষ্টরা মনে করেন প্রতিটি শিল্প, সাহিত্যেরই আছে নির্দিষ্ট শ্রেণী অবস্থান। কমিউনিষ্ট বিপ্লবী শিল্পী সাহিত্যিকদেরও অবশ্যই লক্ষ্য হলো সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থবাহী শিল্প-কলা সৃষ্টি করা এবং শেষ অর্থে সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়া। শ্রেণী অবস্থানকে স্পষ্ট করা। শ্রেণীদায়বদ্ধতার প্রশ্নে এই স্পষ্ট অবস্থান আমরা দেখতে পাব রাজবন্দীদের শিল্প, সাহিত্য চর্চ্চায়। একদিকে তাতে আছে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন, শ্রেণীর প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান, পাশাপাশি নান্দনিক দিক থেকেও তা যথেষ্ট উন্নত মানের। রাজনৈতিক বন্দীদের রাজনৈতিক, মতাদর্শগত অবস্থানের সাথে সাযুজ্য রেখেই শিল্প-কলা প্রশ্নেও তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট।

পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলে আজ যারা রাজনৈতিক বন্দী হিসাবে আটক আছেন, তাদের অধিকাংশর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো তারা মাও সে তুঙের মতবাদের অনুগামী। কমঃ মাও একজন কমিউনিষ্ট আন্দোলনের অগ্রণী শিক্ষক, যিনি মার্কসবাদী বিশ্ববীক্ষাকে আরো উন্নতরূপে বিকশিত করেছিলেন। অর্থাৎ মাওবাদ হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদেরই বিকশিত রূপ। আমরা জানি মার্কসবাদী তত্ত্ব কোন বাগাড়ম্বরতা নয়। এটা হলো কর্মের দিশারী। মার্কসের নিজের বিখ্যাত সেই উক্তিকে স্মরণ করেই বলতে হয় – ‘আজ অবধি দার্শনিকেরা দুনিয়াটাকে শুধু ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু মূল কাজ হলো তাকে বদলানো’। আর কমঃ মাও সে তুঙ, মার্কসবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে বলেছিলেন, ‘মার্কসবাদের মধ্যে হাজারটা সত্য আছে, কিন্তু তার সার কথা হলো প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহই ন্যায়সঙ্গত’।

বস্তুতঃ আজ যারা রাজবন্দী তারা বাস্তবতঃ হচ্ছেন বিপ্লবী, বিদ্রোহী। তারা চাইছেন, প্রচলিত এই পচাগলা ব্যবস্থাটার অন্যায়ের ঝুঁটি ধরে নাড়া দিতে। তারা চাইছেন, এই শোষণমূলক ব্যবস্থাটার উচ্ছেদ ঘটিয়ে ব্যাপক জনতার জন্য একটা ন্যায়ের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে। শ্রেণীহীন, শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত একটা বিশ্ব গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, আর এই লক্ষ্য নিয়েই তারা নিশ্চিত জীবনের আশ্রয় ছেড়ে জনতার অধিকারের লড়াই সংগ্রামে আজ সামিল।

আমাদের দেশের শাসকশ্রেণী এবং তাদের লাল, সবুজ, গেরুয়া রঙের প্রতিনিধিরা – যারা এই দেশকে বিকিয়ে দিচ্ছে বিদেশী বহুজাতিক লুঠেরা ও তাদের দেশীয় মুৎসুদ্দিদের পায়ে- সেই সব দেশবিক্রির ফেরিওয়ালারা, আজ তাই এইসব দেশপ্রেমিক বিদ্রোহীদের ভয় পাচ্ছে। তাই তারা বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মী, নেতাদের ‘উগ্রবাদী’, ‘হিংসার উপাসক’, ‘দেশের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক’ ইত্যাদী হিসাবে জনমানসে চিত্রায়িত করতে চাইছে। তারা আসলে চাইছে যুব সমাজকে বিপথগামী করতে, যাতে তারা ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম না করে। অধিকারের জন্য সোচ্চার না হয়। দেশের সংখ্যাগুরু শ্রমজীবী মানুষের জন্য না ভাবে। শুধু নিজের স্বার্থের চিন্তায় মগ্ন থাকে এবং কেরিয়ার গড়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়ে গড্ডালিকার স্রোতে গা ভাসায়। তাই, সেই লক্ষ্য নিয়ে আজকে তারা আমদানি করেছে এক সেক্স-ভায়োলেন্স সর্বস্ব সংস্কৃতিকে। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রতাবাদ এবং ভোগবাদের এক ককটেল সংস্কৃতি। যা প্রতিটি যুব ও তরুন প্রজন্মকে আত্মস্বার্থকামী করে তুলতে চাইছে। তাই এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা দেশের, দশের কথা ভাবছেন, তারা ওদের চোখে ‘অপরাধী’। তাদের মারার জন্য কোবরা, গ্রেহাউন্ড, জাগুয়ার। তাদের জেলে ভরার জন্য ইউএপিএ, এনসিটিসি, আফস্পা, টাডা, পোটা, পোকা, মোকা কত শত নামের ও ঢঙের নিবর্ত্তনমূলক কালা কানুন। তাদের জন্য জেলখানা। কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ-অভিযান। আবার কর্পোরেটের বিজ্ঞাপনের টাকায় মদতপুষ্ট প্রচারমাধ্যমও তাদের বিরুদ্ধেই রটিয়ে বেড়ায় মন্দ কথা। তাদের নিয়ে কুৎসার গরু কখনো কখনো গাছেও উঠে পড়ে। কিন্তু বাস্তবটা হলো এটাই যে, তারাই জনগণের স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধি। তারাই প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে, ব্যাক্তিস্বার্থের বদলে সামাজিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। লড়াই করছেন। আত্মত্যাগ করছেন। জনগণের প্রতি তাদের ভালবাসা অপরিসীম। তাই, তাদের হৃদয়ও অনেক বেশী সংবেদনশীল। তা প্রতিফলিত হয় তাদের সৃষ্টিকর্মে। সৃজনশীলতায়।